এটা কার জন্য উপযোগী?
তিবন্ধী কিশোরী ও নারী বিশেষত গুরুতর ও বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধী, শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশু ও নারী, তাদের অভিভাবক, পরিচর্যাকারী ও অপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি।
পিরিয়ড একটি প্রাকৃতিক শারীরবৃত্তিয় প্রক্রিয়া। সাধারণত প্রজননক্ষম কন্যাশিশু ও নারীদের প্রতিমাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বিষয়টি ‘মাসিক’ নামেও পরিচিত। এসময় তাদের বিভিন্ন কষ্টকর পরিস্থিতি ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
অনেকেই মনে করে থাকেন, প্রতিবন্ধী কন্যাশিশু ও নারীদের পিরিয়ড হয় না। কারণ তারা প্রতিবন্ধী। বিষয়টি মোটেও সেরকম নয়। তাদেরও এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এক্ষেত্রে অপ্রতিবন্ধী কন্যাশিশু ও নারীদের চেয়ে তাদের জন্য বিষয়টি আরও বেশি কষ্টকর হয়ে থাকে। পর্যাপ্ত সেবা ও সুযোগ না পাওয়ার ফলে তারা বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হয়ে থাকেন।
এই রিসোর্সে মূলত একজন প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারী মাসিক চলাকালে কীভাবে নিজের যত্ন নিতে পারবে সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়েছে।
মাসিক কী?
প্রতি মাসে মেয়েদের ডিম্বাশয় থেকে একটি ডিম্বাণু বের হয়ে ডিম্ববাহী নালীতে আসে এবং একই সময়ে হরমোনের প্রভাবে জরায়ুতে রক্তে ভরা নরম পর্দা তৈরি হয়। এই রক্তে ভরা নরম পর্দা থেকে ডিম্বাণুসহ রক্ত যোনিপথ দিয়ে বেরিয়ে আসে। একেই মাসিক বা ঋতুস্রাব বা পিরিয়ড বলে। মাসিক মেয়েদের শরীরের একটি খুবই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং শারীরিক বিকাশের লক্ষণ। মাসিক হওয়ার পর মেয়েরা সন্তান ধারণ ক্ষমতা লাভ করে। সাধারণত ৮-১৩ বছর বয়সে মাসিক শুরু হয়, তবে কারো কারো ক্ষেত্রে এর আগে বা পরে হতে পারে।
মাসিক চক্র
এক মাসিকের শুরুর সময় থেকে পরবর্তী মাসিক শুরু হবার সময়কে মাসিক চক্র বলে। সাধারণত এই সময়কাল ২৫ থেকে ২৮ দিনের মধ্যে আবর্তিত হয়। মাসিকের রক্তের পরিমাণ কতোটুকু হবে বা কতোদিন থাকবে তা নির্ভর করে হরমোন, শারীরিক গঠন, রক্তের পরিমাণ, বংশগত বৈশিষ্ট্যের উপর। মাসিক সাধারণত ২৮ দিন পর পর হয়ে থাকে, আবার ২৪ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যেও হতে পারে, এর কোনটাই অস্বাভাবিক নয়। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতিমাসেই মাসিক হয় এবং তা ২ থেকে ৭ দিন স্থায়ী হয়। একই মাসে মাসিকের পর পুনরায় রক্তপাত হলে কিংবা মাসিকের রক্তপাত ৭ দিনের বেশি থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। তবে মাসিকের প্রথম ২-১ দিন খুব দুর্বল লাগতে পারে যা স্বাভাবিক। মাসিকের সময় বেশি দুর্বলতা কিংবা অন্য কোন সমস্যা হলে এ ব্যাপারে মা, বোন কিংবা পরিবারের অন্য কোনো অভিজ্ঞ নারী সদস্যদের সহায়তা নিতে হবে, প্রয়োজনে লজ্জা না করে ডাক্তার দেখাতে হবে।
মাসিক সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা
আমাদের দেশে মাসিক সম্পর্কে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা আছে। যেমন:
- মাসিকের সময় প্রতিদিন গোসল করা যাবে না;
- ডিম, দুধ, মাংস ইত্যাদি খাওয়া যাবে না;
- মাসিক হলে সবার থেকে আলাদা থাকতে হবে;
- স্বাভাবিক কাজকর্ম করা যাবে না;
- মাসিক সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা করা যাবে না ইত্যাদি।
সকলকে বুঝিয়ে বলতে হবে, উল্লেখিত ধারণাগুলো ঠিক নয় বরং মাসিকের সময় নিয়মিত গোসল করতে হবে, পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। মাসিক শুরু হলে ভয় বা লজ্জা না পেয়ে পরিবারের নারী সদস্যকে জানাতে হবে ও তার পরামর্শ মেনে চলতে হবে। মাসিক চলাকালে স্বাভাবিক সবধরনের কাজকর্ম অনায়াসে করা যায়, যেমন- স্কুলে যাওয়া, রান্না করা, শিশুকে খাওয়ানো, সংসারের অন্যান্য কাজ করা, বেড়াতে যাওয়া ইত্যাদি।
মাসিক পূর্ব-প্রস্তুতি (শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনসমূহ)
৮-১৩ বছর বয়স বয়ঃসন্ধিকাল ও কৈশোর, যা প্রতিটি মানুষের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। বয়ঃসন্ধিকালে মানুষের শরীর ও মনে নানা ধরনের পরিবর্তন হতে শুরু করে এবং যৌবনে এসব পরিবর্তন পূর্ণতা লাভ করে। সবার ক্ষেত্রে পরিবর্তনগুলো একই সময়ে একই রকম নাও হতে পারে, কিন্তু মনে রাখতে হবে এই পরিবর্তনগুলো অত্যন্ত স্বাভাবিক। এইসব পরিবর্তন নিয়ে লজ্জা, সংকোচ বা দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই। আগে থেকে এসব পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে, রাখতে হবে সঠিক প্রস্তুতি।
বয়ঃসন্ধিকালে কিশোরীদের ক্ষেত্রে সাধারণত যেসব শারীরিক পরিবর্তন দেখা দেয় সেগুলো হলো: স্তন বৃদ্ধি পায়, বগল ও যোনি অঞ্চলে লোম গজায়, ঋতুস্রাব বা মাসিক শুরু হয়, যৌনাঙ্গ বড় হয়, কোমর সরু এবং উরু ও নিতম্ব ভারী হয়, জরায়ু ও ডিম্বাশয় বড় হয় ইত্যাদি। এসব পরিবর্তন খুবই স্বাভাবিক। এসময় নিজেকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। সম্ভাব্য পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে কিশোরীদের তথ্য ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করতে হবে।
মাসিক পূর্ব-প্রস্তুতি (নিজ, পরিবার এবং সমাজের করণীয়)
বয়ঃসন্ধিকালেই কিশোর-কিশোরীরা প্রজনন ক্ষমতা লাভ করে, এসময় থেকেই প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষার প্রয়োজন। অনেকে মনে করেন অবিবাহিত ছেলেমেয়েদের প্রজনন স্বাস্থ্য অর্থাৎ প্রজননতন্ত্রের সুস্থতা, শিশু জন্মগ্রহণ এসব বিষয়ে জানার কোনো দরকার নেই। এ ধারণা সঠিক নয়; কারণ প্রজনন সক্ষম হবার সাথে সাথেই প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানতে পারলে কিশোর-কিশোরীরা সঠিকভাবে নিজেদের যত্ন নিতে পারবে এবং এ শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে সুস্থ-সুন্দর ভবিষ্যত গড়ে তুলতে পারবে। এ সময়ে সঠিক পরামর্শ দিয়ে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদের বলতে হবে যে, মাসিক কোন রোগ নয়।
মাসিক নারীর জীবনচক্রের একটি অংশ। তাই প্রতিটি মেয়ে যাতে মাসিক বিষয়টিকে আতঙ্ক হিসেবে না দেখে, স্বাভাবিকভাবে দেখে এবং সচেতন হয়। সেজন্য পরিবারের অবদান জরুরি। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী নারী ও কিশোরীদের জন্য পরিবারের সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সদস্যরা মাসিক ব্যবস্থাপনা এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করতে পারে। বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, গুরুতর মাত্রার শারীরিক প্রতিবন্ধী, অটিজম ও মানসিক অসুস্থতাজনিত প্রতিবন্ধী নারী ও কিশোরীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং পরামর্শ দেওয়া উচিত যাতে তারা সঠিকভাবে মাসিক ব্যবস্থাপনা করতে পারে।
মাসিকের আগে বা মাসিক চলাকালীন লক্ষণসমূহ
মাসিকের আগে বা মাসিক চলাকালীন নিচে উল্লেখিত লক্ষণ দেখা দিতে পারে:
শারীরিক লক্ষণ
- গা ব্যথা হতে পারে;
- জ্বর হতে পারে;
- মাথা ব্যথা হতে পারে;
- বমি বমি ভাব ও বমি হওয়া;
- ক্লান্তি বা অবসাদ লাগতে পারে;
- ডায়রিয়া হতে পারে;
- স্তন শক্ত ও ব্যথা লাগতে পারে ইত্যাদি।
মানসিক লক্ষণ
- বিষন্ন লাগতে পারে;
- মেজাজ খিটখিটে হতে পারে;
- কাজে মনযোগ কমে যেতে পারে;
- ঘুম কম হতে পারে ইত্যাদি।
মাসিক চক্রের সময় মানসিক চাপ বা অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে। এটি স্বাভাবিক, এবং একে মোকাবিলা করার জন্য পরিবার সহায়তা করতে পারে। মনোবল বজায় রাখতে, প্রয়োজনে পরিবার কল্যাণ স্বাস্থ্যকর্মী বা কাউন্সেলরের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
মাসিকের আগে ও মাসিক চলাকালীন ব্যথা হলে করণীয়
- মাসিক-এর আগে ও মাসিক চলাকালীন কারো কারো ব্যথা হতে পারে, এটি খুবই স্বাভাবিক বিষয়।
- এ সময় স্বাভাবিক কাজকর্ম করা যায়।
- ব্যথা হলে তল পেটে গরম সেক দিতে পারেন।
- একটু বিশ্রাম নিতে পারেন।
- হালকা ব্যায়াম করতে পারেন।
- ব্যথা বেশি হলে দেরি না করে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
প্রতিবন্ধী নারী ও কিশোরীদের দিকে বিশেষ নজর রাখুন। অনেক সময় তারা নিজেদের সমস্যার কথা হয়তো সঠিকভাবে বলতে পারে না। ফলে এ সময়ে তাদের প্রতি পরিবারের সদস্য বা সেবাদানকারীকে তাদের লক্ষণগুলোর প্রতি খেয়াল রাখা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, অটিজম আক্রান্ত ও মানসিক অসুস্থতাজনিত কিশোরী বা নারীরা হয়তো এ সময়ে এই কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করতে পারে।
নির্দেশনা: অবশ্যই পারিবারিক সেবাদানকারীকে প্রতিবন্ধী নারী বা কিশোরীর মাসিকের নিধার্রিত তারিখ সম্পর্কে হিসেব রাখতে হবে। যেনো মাসিকের আগে ব্যবস্থা নেয়া যায়।
প্রতিবন্ধী নারী ও কিশোরীদের জন্য মাসিক ব্যবস্থাপনা
প্রতিবন্ধী নারী ও কিশোরীদের মাসিক ব্যবস্থাপনায় বিশেষ নজর রাখতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিবন্ধী নারী ও কিশোরীরা মাসিক ব্যবস্থাপনায় তাদের শারীরিক ও মানসিক সীমাবদ্ধতার কারণে হয়তো সঠিকভাবে পালন করতে পারেন না। তাই প্রতিবন্ধী নারী ও কিশোরীদের স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করাই উত্তম। আবার নিজেদের মাসিক চক্রের সময় তারা বেশ কিছু অতিরিক্ত সমস্যারও সম্মুখিন হতে পারে। যেমন:
শারীরিক প্রতিবন্ধিতা: হাত, পা বা অন্যান্য অংশে সমস্যা থাকলে স্যানিটারি প্যাড পরিবর্তন করা বা ব্যবহার করা কঠিন হতে পারে।
মানসিক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা: মানসিক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নারী ও কিশোরীরা হয়তো বুঝতেই পারে না তাদের মাসিক হয়েছে- যার ফলে তাদের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কেও তেমন ধারণা থাকে না।
স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের ক্ষেত্রে সমস্যা: সঠিকভাবে স্যানিটারি প্যাড পরা বা পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা কষ্টসাধ্য হতে পারে। ফলে এ সময়ে তাদের প্রতি পরিবারের যে সদস্য বা সেবাদানকারী সরাসরি কাজ করেন তাদেরকে সব সময় সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে, স্যানিটারি প্যাড সময় অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা প্রহণ করতে হবে।
ডাউনলোড
- প্লেইন টেক্সট (ওয়ার্ড)