এটা কার জন্য উপযোগী?
শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, তাদের অভিভাবক, পরিচর্যাকারী ও অপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি।
শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা বাংলাদেশের প্রান্তিক ও অরক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে অন্যতম। একটা সময় ছিল যখন তারা পরিবার ও সমাজে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বসবাস করতো। তাদের মূলধারায় অংশগ্রহণের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ছিল না। সময়ের পরিক্রমায় শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সে বাঁধা পেরিয়ে এখন অনেকটাই স্বনির্ভর ও স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছে।
এই রিসোর্সে মূলত শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের একটি যুব নেটওয়ার্ক গ্রুপের প্রতিকূলতা কাটিয়ে স্বাবলম্বী হওয়া ও নেতৃত্ব বিকাশে এগিয়ে আসার গল্প ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
নৈঃশব্দ থেকে কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা
মতিউর: আমার স্কুলের চলাকালীন মাধ্যমে আমাদেরকে বন্ধুবান্ধবরা তো আমারে ঘৃণায়। আমাকে আলাদাভাবে বসতে দেয়, একসাথে খেলতে দেয়না।
তাসলিমা: ক্লাস করার সময় যে কথাগুলো কইছে সবগুলো কতা হুনছি না। তাই এটা বার বার বান্ধবীর লগে কইছি। বান্ধবী আবার চেতছে। একটা কথা তিনবারের বেশী কইলে চেত ওঠে। একটা কথা একবার কয়, একটা কইলে একটা হুনি, তারা হাসে। নিজে কথা কওয়ার সময় পরে হাসে, এইডা মনে কষ্ট না? আমি প্রতিবন্ধী, আমি কী করতারুম, আমি নিজে কোনো করতারাম?
নাজমুস সাকিব: বন্ধুবান্ধব তেমন একটা ছিলো না, যেটা আগে থেকেই আমি একা। একাই স্কুলে যাইতাম, একাই খেলতাম, বাসার ভেতর থাকতাম। আব্বু আম্মুরও এতোটা আশা ছিলো না যে আমি হয়তো কিছু তাদের স্বপ্ন পূরণ করবো কিংবা তাদের একটা ছেলেকে নিয়ে যে স্বপ্ন থাকে ঐটা আমি পূরণ করতে পারবো, এরকম তাদের কোনো চিন্তা ভাবনা ছিলো না।
জুবায়ের মোল্লা: সিডিডি’র এর এই প্রজেক্টটা ‘Education, Learning and Skills for Person with Deafblindness’ এই প্রজেক্ট এর মাধ্যমে তারা বাসায় গিয়ে একজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে তৈরি করে। স্কুলে আসা পর্যন্ত তাকে যেভাবে তৈরি করতে হয় এই তৈরি করার কাজটা, তারা কীভাবে যোগাযোগ করবে অন্য মানুষের সাথে, নিজের কাজগুলো কীভাবে করবে, নিজের ব্যক্তিগত কাজগুলো কীভাবে করা যায়, কাপড় চেনা থেকে শুরু করে প্রত্যেকটা কাজ। আমাদের কাছে মনে হতে পারে কাজগুলো অনেক সহজ কিন্তু প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য এই কাজগুলো করা যথেষ্ট কঠিন। সেই কাজগুলো তারা সহজ করে দেওয়ার জন্য যেই হোম স্কুলিং গুলো করে থাকেন এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রি-স্কুলিং একটা কথা আছে, যে স্কুলে যাওয়ার পূর্বে তাকে যে শিক্ষাগুলো দেওয়ার সেটা এই প্রজেক্টের মাধ্যমে দেওয়া হয়।
নাজমুস সাকিব: জিবিএস থেকে ছোটবেলা থেকেই আমাকে তারা অনেক ফলো আপ করতো, চোখে চোখে রাখত। নিয়মিত বাসায় আসত সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার। এরকম করে আসতো, আমাকে গোসল করা শিখাইছে, নিজে নিজে খাওয়া দাওয়া শিখাইছে। একটু ঝুঁকে পড়তে হতো, আমার একটু সমস্যা হতো। তো রিডিং ফ্রেম দিয়েছে, ওটা দিয়ে আমি একটু এখন ভালো পড়তে পাড়ি। এছাড়া আমাকে হ্যান্ড ম্যাগনিফাইং গ্লাস, চশমা এবং কান-চোখের ডাক্তারও দেখাইছে।
জুবায়ের: সিডিডি’র মাধ্যমে যে লিডারশীপ ট্রেনিংটা যখন করতে যাই সেখান থেকে এসে আমরা দল গঠন করি।
অনুপা মল্লিক: সেই দলের মাধ্যমে আমরা আমাদের আশপাশের সচেতনতা বৃদ্ধি করছি, আমরা উপজেলায় মিটিং করছি। প্রতিবন্ধিতার বিষয়ে তাদেরকে বুঝিয়েছি যে আমাদের একটি দল আছে, আমরা এই এই কাজ করবো। পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদে বিভিন্ন মিটিং করেছি, অনেক স্কুলে যেয়ে আমরা সচেতনতামূলক মিটিং করেছি এবং আমাদের দলের প্রতি মাসে আমরা একটি মিটিং করি যার মাধ্যমে আমরা আলোচনা করি আমরা কী করতে পারি এবং ভবিষ্যতে কী করব।
বিল্লাল মিয়া: ট্রেনিং পাইয়া, এগুলো জাইনা- বুইঝা কনো কী আছে, পাপড়ি আর সিডিডি আমডারে যখন এটা ধরাই দিছে, বুঝাই দিছে তখন এটা আমরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও আদায় করে আনতে পারতাছি, সমাজসেবা থেকেও আমরা এটা আদায় করে আনতে পারতাছি।
রাকিব: ট্রেনিং করার পরে অনেক কিছু শিখতে পারছি। যেটা হচ্ছে এক্সেলের কাজ শিখতে পারছি, পাওয়ার পয়েন্ট শিখতে পারছি, ওয়ার্ডের কাজ শিখতে পারছি।
তাসলিমা: আমাদের জন্য রিসোর্স হাব হয়েছে। সেখান থেকে প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক তথ্য নেই।
আফরিনা আক্তার: অনেককে আমরা যুব উন্নয়ন থেকে প্রশিক্ষণ করিয়েছি এবং অনেক সময় দেখা যাচ্ছে যে পারিবারিকভাবে তাদেরকে প্রশিক্ষণ করিয়ে আয়বৃদ্ধিমূলক কাজের সাথে সম্পৃক্ত করতে পেরেছি।
আনোয়ার হোসেন: শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী ভাই ও বোন, তারা মোটামুটি এখন কেউ কেউ স্কুলে পড়াশোনা করতেছে, কেউ কৃষি কাজ করতেছে, কেউ টেইলারস এর কাজ শিখে কাজ করতেছে, তারা তাদের অধিকার সমন্ধে অনেকটা তাদের জানা হয়েছে।
রাকিব: আমি নিজেও কোচিং সেন্টারে ওখানকার প্রশ্ন টাইপিং করি, নিজেও কাজ করি। নিজেও আবার ভিডিও এডিটিং করি। নিজেরও বাসায় কম্পিউটার আছে।
অনুপা: আমাদের একটি হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ আছে। যার মাধ্যমে আমরা রংপুর, বগুড়া, সাতক্ষীরা, ঢাকা আমরা যশোরের অনেক ভাই বোনরা যুক্ত আছি এবং আমরা সবাই যোগাযোগ করি।
জুবায়ের: আমরা যেই বাধাগুলোর সম্মুখীন হয়েছি আমার অন্যান্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যেন এই বাধাগুলোর সম্মুখীন না হয়, আর হলেও যেন খুব সহজেই আমরা সেই বাধাগুলো উতরে তাদেরকে শিক্ষার সাথে, মূল স্রোতধারার সাথে যুক্ত রাখতে পারি, এটাই হচ্ছে আমাদের অ্যাডভোকেসির মূল এবং প্রধান লক্ষ।
‘ফ্রম দ্য কনফারেন্স অ্যান্ড ট্র্যাক উই লার্ন্ট দ্যাট উই আর ডিজেবলড বাট উই্ আর নট আনঅ্যাবল টু ডু সামথিং (From the conference and track we learnt that We are disabled but we are not unable to do something)’
জুবায়ের: বাইরের দেশে যাওয়ার কথা তো কখনো ভাবিনি আর এরকম সুন্দর একটা পরিবেশে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার এই যে সাল চলে অর্থাৎ ২০২৫ সালে ফেব্রুয়ারি ২৮ তারিখে আমরা বাংলাদেশ থেকে নেপালের উদ্দেশে রওনা করি। সেখানে পোখারায় আমরা পৌঁছাই। সেখানে ডিবিআই ডেফব্লাইন্ড ইন্টারন্যাশনালের (DBI Deafblind International) একটা কনফারেন্স ছিল তিন দিনব্যাপী, সেই কনফারেন্সে আমরা অংশগ্রহণ করি। যেখানে ২২টি দেশ থেকে ৩০০’রও বেশি প্রতিনিধি আমাদের সাথে যুক্ত হয়। আমরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কিন্তু আমরা কোনকিছু করতে একবারে অক্ষম নই। আমরাও পারি দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে, পৃথিবীকে সুন্দর করার কাজে অংশগ্রহণ করতে।