এটা কার জন্য উপযোগী?
গুরুতর ও বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধী শিশু বিশেষত শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশু, তাদের অভিভাবক, পরিচর্যাকারী ও অপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি।
প্রতিটি শিশুই বেড়ে ওঠার এবং শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু প্রতিবন্ধী শিশুরা বিশেষত যাদের গুরুতর ও বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতা আছে, তারা নানারকম কারণে শিক্ষা লাভের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এ ধরনের শিশুদের অধিকাংশই শিক্ষা সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের তুলনায় বহুগুণ পিছিয়ে আছে।
এক সময় শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত গুরুতর ও বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধী শিশুরা বাড়িভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে এখন মূলধারার স্কুলে ভর্তি হয়ে লেখাপড়া করছে। বাড়িভিত্তিক শিক্ষা তাদের জীবনে আমূল পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করে চলেছে। এই রিসোর্সে মূলত গুরুতর ও বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধী শিশুদের বাড়িভিত্তিক শিক্ষা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়েছে।
ভিডিও প্রতিলিপি
একজন প্রতিবন্ধী শিশু কবিতা আবৃত্তি করছে
‘অশোক ফুটে ডালে ডালে, আম গাছে পাতা। ইলিশ হলো মাছের রাজা, ঈদ এসেছে হবে মজা। উট চলেছে হেলেদুলে, ঊর্মি দেখো নদীর কূলে। ঋতু আসে ঋতু যায়, ফুলে ফলে মন মাতায়। একতারাতে সুর ওঠেছে, ঐরাবত… নীল আকাশে সবুজ ঘাসে..।
বর্ণনাকারী: বাংলাদেশের নরসিংদী এবং সিরাজগঞ্জ জেলায় এক নীরব বিপ্লব ঘটে চলছে। এক সময় শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত গুরুতর ও বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধী শিশুরা বাড়িভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে এখন মূলধারার স্কুলে ভর্তি হয়ে লেখাপড়া করছে। বাড়িভিত্তিক শিক্ষা তাদের জীবনে আমূল পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করে চলেছে। প্রতিটি শিশুই বেড়ে ওঠার এবং শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু প্রতিবন্ধী শিশুরা বিশেষত যাদের গুরুতর ও বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতা আছে, তারা নানারকম কারণে শিক্ষা লাভের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এ ধরনের শিশুদের অধিকাংশই শিক্ষা সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের তুলনায় বহুগুণ পিছিয়ে আছে।
এ.এইচ.এম. নোমান খান, প্রতিষ্ঠাতা, সিডিডি: প্রতিবন্ধী মানুষের শিক্ষার অধিকার আজকে সর্বজনস্বীকৃত। ২০১৩ সালে প্রতিবন্ধী নাগরিক অধিকার আইনে সে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাদের এই অধিকারটাকে ধরে রাখা কঠিন অনেক ক্ষেত্রেই। আমরা দেখেছি যে, বিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিশুরা ভর্তি হয়েছে কিন্তু সেইসাথে তাদের ঝরে পড়ার সংখ্যাটাও বেড়েছে।
এ ধরনের জটিল প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষেত্রে আমরা যদি একটা প্রক্রিয়া ব্যবহার করতে পারি যে তার বাড়িতে গিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে তাকে যদি স্কুলমুখী করতে পারি, সেক্ষেত্রে তার প্রাথমিকভাবে সেই জড়তাটা কেটে আসবে এবং তাকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে শেখার মতো একটা পরিবেশ সমন্ধে পরিচিত করাবে। আমরা যদি এই গৃহভিত্তিক ব্যবস্থাটা চালু করতে পারি তাহলে ভর্তির সংখ্যাও বাড়বে এবং পরবর্তী সময়ে তাদের ঝরে পড়ার সংখ্যাটাও কমবে।
মাহমুদের মা, কেয়ারগিভার : মাহমুদ আমার ছেলে। আগে ইস্কুলেও যাইতো না, তারপরে বাইরে বাইরে ঘুরতো। সমস্যা আছিলো। কিছুই পারতো না। খাওয়া দাওয়া, নিজে খাওয়াই দেওয়া লাগতো। হাতে ধইরা খাইতে পারতো না।
বর্ণনাকারী: বাড়িভিত্তিক শিক্ষা এক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনা হতে পারে। সেন্স ইন্টারন্যাশনালের সাথে পূর্ববর্তী কাজের অভিজ্ঞতা ও তাদের কারিগরী সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে সিডিডি ও এর তিনটি স্থানীয় অংশীদার সংস্থা ‘শিখবো সবাই’ প্রকল্পের অধীনে গুরুতর ও বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বাড়িভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এই প্রকল্পটি ২০২২ সালের এপ্রিল মাস থেকে বাংলাদেশের নরসিংদী ও সিরাজগঞ্জ জেলার তিনটি উপজেলায় ইউকেএইডের ইনক্লুসিভ ফিউচারের আর্থিক সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।
নাসিমা আক্তার, এইচবিইএফ: সেন্সের সহযোগিতায় সিডিডি আমাদেরকে বাড়িভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমকে কীভাবে পরিচালনা করতে হবে এই কৌশলটুকু প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমাদেরকে হাতে কলমে শিখিয়েছে। প্রশিক্ষণ পাবার পর আমরা স্থানীয় ওপিডি সদস্যদের সহযোগিতায় নরসিংদী সদর, সিরাজগঞ্জ সদর ও তারাশ উপজেলার ৪৫টি স্কুলের কর্ম এলাকায় অন্তর্ভুক্ত ঈশানের মতো ১৬০ জন গুরুতর ও বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধী শিশু খুঁজে বের করি। ওই শিশুগুলো খুঁজে বের করার পর ওই পরিবারের সাথে আমরা প্রস্তাব করি, তাদের সাথে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা দেওয়ার জন্য, কার্যক্রম করার জন্য। পরিবারের অনুমতি প্রাপ্তি সাপেক্ষে আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রতিবন্ধী শিশুদের বাড়ি ভিত্তিক সেবার কার্যক্রমটি শুরু করি।
ইসরাত জাহান, অ্যাডভোকেসি অফিসার: বাড়িভিত্তিক শিক্ষা আমাদেরকে প্রতিটি শিশুর জন্য একটি স্বতন্ত্র পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করে। আমাদের প্রশিক্ষিত হোম বেজড এজুকেশন ফেসিলিটেটররা বাড়িতে গিয়ে প্রথমে শিশুর ফাংশনাল অ্যাসেসমেন্ট করে যার মাধ্যমে শিশুর সক্ষমতা যাচাই করা হয়। পাশাপাশি তার ক্লিনিক্যাল অ্যাসেসমেন্টও করা হয়। ফাংশনাল অ্যাসেসমেন্ট ও ক্লিনিক্যাল অ্যাসেসমেন্টের রেজাল্টের ওপর ভিত্তি করে আমরা তার জন্য একটি ইন্ডিভিজ্যুয়ালাইজড এজুকেশন প্ল্যান প্রণয়ন করে থাকি।
আমরা শিশুর স্বাক্ষরতা, তার যোগাযোগ দক্ষতার উন্নয়ন, তার বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়ন এবং অন্যান্য যেই এরিয়াগুলোতে তার উন্নয়ন দরকার হয় সেই কাজগুলো করে থাকি। প্রত্যেকটা কাজেই শিশুর পরিবারকে আমরা ইনভলভ করে থাকি যেন শিশুর পরিবার এই পুরো প্রসেসটা সম্পর্কে অবগত থাকেন এবং তারাও আমাদের কাজটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করতে পারেন। অনেক শিশুর সহায়ক উপকরণ দরকার হয়ে থাকে। আমরা সেক্ষেত্রে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়ক উপকরণও প্রদান করে থাকি। শিশুর সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে তার উন্নতি সাধন করা এবং তাকে বিদ্যালয়ে শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য।
কেয়ারগিভার ১: এই ম্যাডামে সবকিছু শিখায়। গোসল শিখাইছে, লেখা শিখাইছে, হের চলাচল- খেলা শিখাইছে। এরপরে সব মিলান্তি টিলান্তি শিখাইছে।
কেয়ারগিভার ২: থেরাপি চলতাছে, ব্যায়াম চলতাছে। এখন আগে থেইকা অনেক ভালো, অনেক বেটার।
কেয়ারগিভার ৩: খাওয়ার কথা কইবার পারে, গোসল করার কথা কইবার পারে, স্কুলে যাওয়ার কথা, সবকিছুই এখন ও মুখ ফুটে কইবার পারে। আবার নিজের কাজ ও নিজেই গোছায়।
জান্নাত, উপকারভোগী: আপায় আসার জন্য আমি অপেক্ষা করি। আমাকে শিক্ষা দেয়, মজা করে শিখায়, আপা আসলে আমার মন ভালো হয়ে যায়।
বর্ণনাকারী: বাড়িভিত্তিক শিক্ষা শুধুমাত্র শিশুর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দিকেই নজর দেয় না বরং শিশুর প্রকৃত প্রয়োজন, সক্ষমতা এবং আগ্রহের দিকে লক্ষ্য রাখে। যার মধ্যে রয়েছে ফিজিওথেরাপি, জীবন দক্ষতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ এবং চলাচল ও যোগাযোগের দক্ষতার উন্নয়ন। এইসব কিছুই শিশুর পরিচিত পরিবেশের মধ্যে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যা গ্রহণ করা তার জন্য সহজ।
সৌরভ রায়, ফিজিওথেরাপিস্ট: বাড়িভিত্তিক শিক্ষা আমাদের ফ্যাসিলিটর, কেয়ারগিভার, ওপিডি সদস্যগণ এবং পরিবারের সদস্যগণের সাথে কাজ করার সুযোগ করে দেয়। যাতে ফিজিওথেরাপিকে শিশুর শিখন কার্যক্রমের সাথে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। আমরা ফার্স্টে একটি শিশুর অ্যাসেসমেন্ট করি এবং সেই অ্যাসেসমেন্টের ওপর বেজ করে একটি রিহ্যাবিলিটেশন প্ল্যান করি। ফ্যাসিলেটররা সেই প্ল্যানটি তাদের আইইপিতে অন্তর্ভুক্ত করে এবং সেই অনুযায়ী শিশুর উন্নয়নের কাজ করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিশুর উন্নয়নকে আরও ত্বরান্বিত করা হয়।
বর্ণনাকারী: উল্লেখিত এই কার্যক্রমের ফলাফল খুবই দৃশ্যমান এবং সম্ভাবনাময়। ২০২২ এ মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করে সেন্স ও সিডিডি’র এই যুগান্তকারী কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে ১৯০ জন গুরুতর এবং বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধী শিশুকে শিক্ষা সহায়তা করেছে। যাদের প্রায় সবাই তাদের আইইপির গোলগুলোতে উন্নতি করেছে।
উল্লেখ্য যে, এই ফ্যাসিলিটেটরদের হাত ধরেই এদের মধ্যে ৯০ জন শিশু সফলভাবে নিকটস্থ স্কুলগুলোতে ভর্তির মাধ্যমে মূলধারার শিক্ষায় সম্পৃক্ত হয়েছে এবং লেখাপড়া চালিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে। একীভূত শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য যে প্রাথমিক স্বাক্ষরতা, দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাস প্রয়োজন তা বাড়িভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে শিশুদের প্রদান করা হচ্ছে।
কেয়ারগিভার ৪: আমনেগো সহযোগিতায় আল্লাহর রহমতে আসমা ম্যাডামের লেইগ্গা হেয় কারেনও পাইছে, ইস্কুলেও ভর্তি হইছে। অহন নামডাও লেখতারে, অ, আ, ক, খ পর্যন্ত পড়তে পারে।
ওয়াদুত হাসান, এইচবিইএফ: প্রথমে কোনো বাড়িতেই আমাদেরকে এইভাবে সাদরে গ্রহণ করে নাই। উনারা বলতো এই যে এক বাক্যে এই সার্ভিস আমার দরকার নাই। বা এই প্রতিবন্ধী শিশু দিয়া আমার কী হবে? ওকে লেখাপড়া করাই কী হইতে পারবে? তখন আমি ওনাদেরকে বুঝাইলাম যে, আমি একজন প্রতিবন্ধী মানুষ, আমি অনার্স করতেছি, দ্বিতীয় বর্ষে পড়তেছি প্লাস স্বেচ্ছাসেবী কাজ করতেছি। আমি যদি পারি, অ্যাজ অ্যা প্রতিবন্ধী মানুষ হিসেবে, ও পারবে। ও কে একটু আপনারা সুযোগ দিতে হবে।
জয়শ্রী সাহা, শিক্ষক: অতিমাত্রায় যারা প্রতিবন্ধী আছে, সেসকল শিশুদেরকে বাড়িভিত্তিক যে শিক্ষাটা দিয়ে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসা হয় সেসকল শিক্ষার্থীদেরকে আমাদের সরাসরি শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করিয়ে আমাদের পাঠদান কার্যক্রম সহজ হয় এবং এই প্রতিবন্ধী শিশুগুলো আগে থেকেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে থাকে। হোম বেজড ফেসিলিটেটর যারা আছেন তারা তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়েই বিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। এতে করে আমাদের কাজ অনেক বেশি সহজ হয়।
বর্ণনাকারী: বাড়িভিত্তিক শিক্ষা প্রতিবন্ধী শিশু এবং তাদের পরিবারের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে তাদের জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দ্বার উন্মোচন করেছে। এমন একটি বাংলাদেশের কথা কল্পনা করুন যেখানে সক্ষমতা নির্বিশেষে প্রতিটি শিশুর পরিপূর্ণ সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ রয়েছে। বাড়িভিত্তিক শিক্ষা সেই রূপকল্পকে বাস্তবে পরিণত করতে পারে।
অর্পন, উপকারভোগী: আমি আগে ইস্কুলে পড়াশোনা করতাম না। ম্যাডাম আমারে বাইত পড়াইয়া ইস্কুলে ভর্তি করাইছে। আমি এহন প্রত্যেকদিন ইস্কুলে আহি। ইস্কুলে আসলে আমার অনেক ভাল্লাগে। আমি বড় হইয়া ড্রোন চালাইতে চাই।
বর্ণনাকারী: আসুন, আমরা সম্মিলিতভাবে বাড়িভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমে নিয়মিত সহায়তা ও বিনিয়োগ করি এবং বাংলাদেশের প্রকৃত একীভূত শিক্ষার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করি। কোনো শিশুই যেন শিক্ষা লাভের অধিকার থেকে বাদ না পড়ে তা নিশ্চিত করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। বাড়িভিত্তিক শিক্ষা হোক প্রতিবন্ধী শিশুর স্কুলে অন্তর্ভুক্তির পাথেয়।