এটা কার জন্য উপযোগী?
প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারী বিশেষত গুরুতর ও বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধী, শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশু ও নারী, তাদের অভিভাবক, পরিচর্যাকারী ও অপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি।
পিরিয়ড একটি প্রাকৃতিক শারীরবৃত্তিয় প্রক্রিয়া। সাধারণত প্রজননক্ষম কন্যাশিশু ও নারীদের প্রতিমাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বিষয়টি ‘মাসিক’ নামেও পরিচিত। এসময় তাদের বিভিন্ন কষ্টকর পরিস্থিতি ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
অনেকেই মনে করে থাকেন, প্রতিবন্ধী কন্যাশিশু ও নারীদের পিরিয়ড হয় না। কারণ তারা প্রতিবন্ধী। বিষয়টি মোটেও সেরকম নয়। তাদেরও এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এক্ষেত্রে অপ্রতিবন্ধী কন্যাশিশু ও নারীদের চেয়ে তাদের জন্য বিষয়টি আরও বেশি কষ্টকর হয়ে থাকে।
পর্যাপ্ত সেবা ও সুযোগ না পাওয়ার ফলে তারা বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হয়ে থাকেন। এই রিসোর্সে মূলত একজন প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারী মাসিক চলাকালে কীভাবে নিজের যত্ন নিতে পারবে সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়েছে।
মাসিককালীন ব্যবহৃত কাপড়ের সঠিক ব্যবহার
- মাসিকের সময় রক্ত যাতে বাইরে গড়িয়ে না পড়ে সেজন্য পরিস্কার কাপড় ব্যবহার করতে হবে।
- অবশ্যই সুতি কাপড় ব্যবহার করতে হবে কারণ, সুতি কাপড়ের শোষণ ক্ষমতা ভালো।
- সিনথেটিক কাপড় ব্যবহার করা যাবে না, কারণ এই ধরনের কাপড়ের শোষণ ক্ষমতা কম হয়। যা চামড়ায় খারাপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
- প্রতি ৩-৪ ঘন্টা পর পর ব্যবহৃত কাপড় পরিবর্তন করুন।
- প্রতিবার ব্যবহারের পর কাপড়টি সাবান দিয়ে নিরাপদ পানিতে ধুয়ে কড়া রোদে শুকাতে হবে যাতে কাপড়ে কোন জীবাণু বেঁচে না থাকে।
- একই কাপড় বারবার ব্যবহার করা যাবে, যদি তা সঠিক উপায়ে পরিষ্কার, শুকানো ও সংরক্ষণ করা হয়।
মাসিক ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত কাপড়ের সঠিক সংরক্ষণ
- প্রতিবার ব্যবহারের পর কাপড়টি সাবান দিয়ে নিরাপদ পানিতে ধুয়ে কড়া রোদে শুকাতে হবে যাতে কাপড়ে কোনো জীবাণু বেঁচে না থাকে।
- কোনভাবেই ব্যবহৃত কাপড়টি নালা-ডোবা বা ময়লা পানিতে ধোয়া যাবে না। এতে কাপড়ে জীবাণু জন্মাতে পারে এবং সেখান থেকে জীবাণুর সংক্রমনের ফলে প্রজননতন্ত্রের ইনফেকশন হতে পারে।
- অন্ধকার ও আলো-বাতাসবিহীন জায়গায় শুকালে স্যাঁতস্যাতে থাকার ফলে কাপড়ে জীবাণু জন্মাতে পারে। তাই কড়া রোদে ব্যবহৃত কাপড় শুকান।
- মাসিক শেষ হবার পর কাপড়গুলো ধুয়ে শুকিয়ে ও সম্ভব হলে ইস্ত্রি করে একটি ব্যাগে বা জীবাণুমুক্ত বাক্সে রাখুন।
- কাপড়ে যাতে ছত্রাক জন্মাতে না পারে এবং কাপড়ের ভিতর তেলাপোকা কিংবা অন্য পোকামাকড় ঢুকে ডিম পাড়তে না পারে সেজন্য মাসিকে ব্যবহৃত কাপড় কখনোই খোলা অবস্থায় ও কোন স্যাঁতস্যাতে স্থানে রাখা যাবে না।
মাসিককালীন প্যাড-এর সঠিক ব্যবহার
- মাসিকের সময় সঠিক নিয়মে প্যাড ব্যবহার করা স্বাস্থ্যসম্মত।
- বাজারে অনেক ধরনের স্যানিটারি প্যাড কিনতে পাওয়া যায়।
- যে ধরনের প্যাড ব্যবহার করে আপনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন সেটিই ব্যবহার করবেন।
- একটি প্যাড ১ বারই ব্যবহার করতে হয়। ব্যবহার বিধি অনুসরণ করে প্যাড ব্যবহার করবেন।
- সাধারণত প্রতি ৪-৬ ঘন্টা পর পর প্যাড পরিবর্তন করা জরুরী। তবে মাসিকের সময় বের হয়ে আসা রক্তের পরিমাণের উপর তা নির্ভর করে।
মাসিকের প্যাড ব্যবহারের পর করণীয়
- ব্যবহৃত প্যাড যেখানে সেখানে, যেমন- পুকুর, নালা বা খাল, নর্দমা ইত্যাদিতে ফেলা যাবে না;
- ব্যবহৃত প্যাড বা কাপড় বাথরুমের প্যানে বা কমোডে ফেলা যাবে না;
- ব্যবহৃত প্যাড বা কাপড় পরিবেশবান্ধব উপায়ে, যেমন- কাগজে মুড়ে ফেলে ডাস্টবিনে অথবা নিরাপদ স্থানে ফেলতে হবে;
- মনে রাখতে হবে ব্যবহৃত প্যাড যেন মাটির বা পানির সংস্পর্শে না আসতে পারে, তাহলে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হবে।
মাসিক চলাকালীন শারীরিক সম্পর্ক
- ধর্মীয় দিক থেকে মাসিক চলাকালে যৌন মিলনে বিরত থাকার কথা থাকলেও কোন কোন গবেষণা বলছে, মাসিকের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের কোন সমস্যা নেই। তবে অবশ্যই যৌন মিলন হতে হবে স্বামী-স্ত্রীর দু’জনের ঐক্যমতের ভিত্তিতে। স্বাচ্ছন্দ্য বোধ না করলে এ সময়ে বিরত থাকাই উত্তম।
- সাধারণত মাসিকের সময় নারীরা পেটের অসহ্য ব্যথার কারণে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হতে চান না। বিশেষ করে যাদের বেদনাদায়ক মাসিক (ডিসমেনোরিয়া) হয় সে ধরনের নারীরা মাসিকের সময় শারীরিক সম্পর্ক এড়াতে চাইবেন, যা স্বাভাবিক।
- একটি গবেষণার রিপোর্ট অনুযায়ী, মাসিক চলাকালীন নারীদের যোনিপথে সংক্রমণের প্রবণতা বেশি থাকে। মাসিকের সময় যৌন মিলন করলে যৌন রোগ ছড়াতে পারে।
- মাসিক চলাকালীন শারীরিক মিলন করলে অবশ্যই কনডম ব্যবহার করতে হবে। কারণ, এই সময়ে অরক্ষিত যৌন মিলনে যৌনরোগের ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি গর্ভধারনের সম্ভাবনা রয়েছে।
মাসিকের অব্যবস্থাপনার ক্ষতিকর দিক
মাসিকের সঠিক ব্যবস্থাপনা একজন নারীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সঠিক নিয়মে মাসিকের ব্যবস্থাপনা না করলে একজন নারী ভবিষ্যতে-
- প্রজননতন্ত্রের বিভিন্ন সংক্রমণে ভুগতে পারেন।
- বিভিন্ন যৌনরোগে ভুগতে পারেন।
- সন্তানধারণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
মাসিকের সময় পুষ্টিকর খাবারের প্রয়োজনীয়তা
- মাসিকের সময় মেয়েদের শরীর থেকে যে রক্ত বের হয়ে যায়, তা পূরণ করার জন্য বেশি করে শাক-সবজি ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। এ সময়ে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ না করলে শরীর দুর্বল হয়ে যেতে পারে, শরীরে রক্তশূণ্যতা দেখা দিতে পারে;
- মাসিকের সময় মেয়েদের শরীরে যে পুষ্টির ঘাটতি হয় তা পূরণের জন্য বেশি করে আয়রন ও ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার খেতে হবে, যেমন; কচুশাক, লাউশাক, পাটশাক, লালশাক, গুড়, ডিম, কলিজা, শুটকি মাছ ইত্যাদি আয়রণযুক্ত খাবার খেতে হবে;
- গুড়, ডিম, দুধ, দই, ছোট মাছ, মুরগির মাংস ইত্যাদি ক্যালসিয়াম যুক্ত খাবার খেতে হবে।
মাসিকের সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও বিশ্রাম
- মাসিকের সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার কোন বিকল্প নেই। মাসিকের সময় পরিষ্কার থাকলে প্রজননতন্ত্রে বিভিন্ন রকমের সংক্রমণসহ অনেক রোগ হতে পারে না।
- নিয়মিত গোসল করতে হবে, যোনিপথ ও এর আশেপাশের স্থান নিরাপদ পানি ব্যবহার করে নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে।
- প্রতিদিন মাসিকের কাপড় বা প্যাড প্রয়োজন অনুযায়ী বদলাতে হবে।
- কখনোই ভেজা বা অপরিষ্কার কাপড় ব্যবহার করা যাবে না।
- ব্যবহার করা কাপড় বা প্যাড বদলানোর পর হাত ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে।
- কাপড় রোদে শুকিয়ে ভাজ করে শুকনো স্থানে রাখলে পরবর্তী মাসিকের সময় তা ব্যবহার করা যায়।
- দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকতে হবে।
- স্বাভাবিক কাজকর্মের পাশাপাশি পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে।
বিদ্যালয় বা কর্মক্ষেত্রে মাসিক-এর প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা
মাসিক একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের (বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র) সহযোগিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যেমন-
- মাসিকের তারিখের আগে মাসিকে ব্যবহৃত কাপড় বা প্যাড প্রস্তুত রাখতে হবে।
- বিদ্যালয় বা কর্মক্ষেত্রে যাবার সময় মাসিক পরিচর্যায় ব্যবহৃত কাপড় বা প্যাড সাথে করে নিয়ে যেতে হবে।
- পরিবার এবং প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে মাসিক বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে এবং মাসিকের ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
- মাসিক চলাকালীন কোন সমস্যা হলে স্কুলে শিক্ষিকার কাছ থেকে অথবা কর্মক্ষেত্রে নারী সহকর্মীর কাছ থেকে আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।
- বিদ্যালয়ে বা কর্মক্ষেত্রে প্যাড বা কাপড় ফেলার ব্যবস্থা না থাকলে সাথে একটি প্লাস্টিক ব্যাগ রাখতে হবে, যাতে প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে বাড়িতে এসে ব্যবস্থা নেয়া যায়।
জরুরী বা দুর্যোগকালীন মাসিক-এর ব্যবস্থাপনা
আমাদের দেশ বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়ে থাকে। অনেক সময় আমাদেরকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচতে আশ্রয় কেন্দ্রে জরুরিভাবে যেতে হয়। আগে থেকে সঠিক প্রস্তুতি না থাকলে সে সময় মাসিক ব্যবস্থাপনা খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে। তাই-
- বাড়িতে জরুরি অবস্থার কথা বিবেচনা করে, পরিস্কার বাক্স বা ব্যাগে মাসিক ব্যবস্থাপনা সামগ্রী (কিটস) গুছিয়ে রাখুন।
- জরুরী অবস্থায় আশ্রয়কেন্দ্রে যাবার সময় যে পরিস্কার বাক্স বা ব্যাগে মাসিক ব্যবস্থাপনা সামগ্রী (কিটস) গুছিয়ে রাখা হয়েছিল সেটিকে সাথে করে নিয়ে যেতে হবে।
- পরিবারের কিশোরী, বিশেষ করে প্রতিবন্ধী কিশোরী বা নারীদের কথা বিবেচনায় রেখে সকল আশ্রয়কেন্দ্রে নারীদের জন্য নিরাপদ ল্যাট্রিন, পানি, মাসিকের প্যাড ফেলার আলাদা বিন বা ঢাকনাযুক্ত বাক্স আছে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে।
- টয়লেট বা বাথরুমগুলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সকলের জন্য সহজে ব্যবহার করতে পারে এবং মাসিক ব্যবস্থাপনার জন্য উপযুক্ত যেনো তারা মাসিকের কাপড় ধুতে, শুকাতে অথবা প্যাড নিরাপদে ফেলতে পারে সে ব্যবস্থা আগে থেকেই রাখা।
- পরিবার এবং প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে জরুরি সময়ে মাসিক বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
- জরুরি অবস্থায় মাসিকের ব্যবস্থাপনা দরকার সঠিক পূর্বপ্রস্তুতি এবং সকলের সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব।
মাসিক ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক সেবা কেন্দ্রসমূহ
মাসিক বা প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক যে কোন সমস্যায়, যে সকল জায়গা থেকে তথ্য, পরামর্শ ও সেবা গ্রহণ করা যাবে:
- নিজ এলাকায় দায়িত্বরত স্বাস্থ্য সহকারী, পরিবার কল্যাণ সহকারী;
- স্যাটেলাইট ক্লিনিক;
- কমিউনিটি ক্লিনিক;
- ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র;
- উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স;
- মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র;
- জেলা সদর হাসপাতাল
- এনজিও ক্লিনিক ইত্যাদি।
মাসিক একটি স্বাভাবিক বিষয় এবং মেয়েদের একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। এ নিয়ে ভয়, ঘৃণা, লজ্জা কিংবা মন খারাপের কিছু নেই। এ ব্যাপারে সকলের সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ডাউনলোড
- প্লেইন টেক্সট (ওয়ার্ড)