এটা কার জন্য উপযোগী?
অভিভাবক/পরিচর্যাকারী এবং শিক্ষাকারী
ভূমিকা
সঙ্গীত ও নাচ শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য সমৃদ্ধ, বহু-ইন্দ্রীয় (multisensory) অভিজ্ঞতা তৈরি করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এই নির্দেশিকাটি সঙ্গীত ও চলাচলের মাধ্যমে যোগাযোগ, মোটর দক্ষতা ও সামাজিক ভাব আদান-প্রদান উন্নত করার জন্য ব্যবহারিক কৌশল প্রদান করবে। বাড়ি, স্কুল বা সম্প্রদায় (কমিউনিটি) যেখানেই হোক, এসব কার্যক্রম দৈনন্দিন মুহূর্তগুলোকে শেখা ও সংযোগ তৈরির সুযোগে পরিণত করতে পারে।
প্রয়োজনীয় উপকরণ
- সহজ বাদ্যযন্ত্র: ড্রাম, রিদম স্টিক, ট্যাম্বুরিন, শেকার, ঘণ্টা।
- ঘরের জিনিসপত্র: হাঁড়ি, পাতিল, প্লাস্টিকের পাত্র, কাঠের চামচ।
- রেকর্ড করা সঙ্গীতের জন্য মিউজিক প্লেয়ার বা রেডিও।
- মুক্তভাবে নড়াচড়ার জন্য খোলা মেঝে বা নরম ম্যাট।
- প্রাথমিক পর্যায়ের শনাক্তকারির কাছ থেকে (যেমন: অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, অভিভাবক/পরিবারের সদস্য, শিক্ষক ইত্যাদি) হাতের ওপর হাত অথবা হাতের নিচে হাত রেখে (হ্যান্ড-ওভার-হ্যান্ড বা হ্যান্ড-আন্ডার-হ্যান্ড) সহায়তা।
- দৃশ্যগত শক্তিবৃদ্ধি ও নিজেকে চেনার জন্য আয়না।
- চলাচলে সমস্যাযুক্ত শিশুদের জন্য নন-স্লিপ ম্যাট বা স্থির চেয়ার।
সঙ্গীতের মাধ্যমে সম্পৃক্ততার ধাপ
১. পরিবেশ তৈরি করা
- শিশুদের অর্ধবৃত্ত আকারে বসান এবং তাদের পিছনে প্রাথমিকভাবে শারীরিক সহায়তা করার জন্য একজন পরিচর্যাকারী বা সেবাদানকারিকে রাখুন। বাড়িতেও একই পরিবেশ তৈরি করতে কুশন, চেয়ার বা নরম ম্যাট ব্যবহার করা যেতে পারে।
- বাদ্যযন্ত্রগুলো এক এক করে পরিচয় করিয়ে দিন এবং শিশুকে সেসব স্পর্শ করিয়ে আরও জানার সুযোগ দিন।
২. তাল ধরার অনুশীলন
- সহজ বিট দিয়ে শুরু করুন। যেমন টোকা দেওয়া, তালি দেওয়া বা হালকা গুনগুন করা।
- শ্রবণশক্তি ব্যবহার করে, বাদ্যযন্ত্র বা মেঝের কম্পন অনুভব করে, অথবা স্পর্শের মাধ্যমে শিশুদের তাদের নিজস্ব উপায়ে সাড়া দিতে উৎসাহ দিন।
শিশুদেরকে এককভাবে ও সহপাঠিদের সঙ্গে একত্রে শব্দ অন্বেষণের সুযোগ দিন, যেখানে সবাই পালাক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়।
৩. ব্যক্তিগত চাহিদা অনুযায়ী মানিয়ে নেওয়া
- প্রতিটি শিশুর শব্দ গ্রহণের পছন্দের পদ্ধতি শনাক্ত করুন (শোনা, স্পর্শ, মেঝের কম্পন)।
- তাদের প্রতিক্রিয়া শক্তিশালী করতে বারবার অনুশীলনের সুযোগ দিন।
৪. নড়াচড়া যুক্ত করা
- শিশুদের সঙ্গীতের তাল অনুযায়ী দুলতে, দোলাতে, তালি দিতে বা নাচতে সহায়তা করুন।
- সীমিত চলাচলক্ষম শিশুদের আরামদায়কভাবে বসিয়ে বা শুইয়ে টোকা বা কম্পনের মতো ইন্দ্রিয়গত উদ্দীপনা দিন। যাতে তারা এই কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে।
- আত্মপরিচয় ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে আয়না ব্যবহার করুন।
৫. যোগাযোগ ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়া বাড়ানো
- প্রতিটি সঙ্গীতের পর প্রশংসা ও ইতিবাচক মন্তব্য করুন। যেমন: “তুমি যেভাবে ড্রাম বাজালে, তা খুব ভালো লাগলো!”
- শিশুদের কোন বাদ্যযন্ত্র বাজাবে বা কখন বাজাবে সেটি পছন্দ করার সুযোগ দিন।
- থেরাপির মতো চ্যালেঞ্জিং কার্যক্রমের সময় গান গেয়ে পরিবেশকে সহজ ও আনন্দময় করুন।
সফলতার জন্য কিছু পরামর্শ
- ধারাবাহিকতা: নিয়মিত সঙ্গীত সেশনের একটি রুটিন তৈরি করুন।
- মানিয়ে নেওয়া: হাতে থাকা যেকোনো বাদ্যযন্ত্র বা উপকরণ ব্যবহার করুন।
- স্পষ্ট সংকেত: কোনো কাজ করার আগে তা বর্ণনা করুন।
- অন্তর্ভুক্তি: চলাচল বা সংবেদনশীল পছন্দ যাই হোক না কেন, প্রতিটি শিশুকে অংশগ্রহণের সুযোগ দিন।
- সম্পৃক্ততা: আকর্ষণীয় বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করুন যাতে শিশু যোগাযোগ করতে উৎসাহিত হয় (যেমন—শিশুকে অনুরোধ করার জন্য ড্রাম সামনে ধরা)।
সব ধরনের সক্ষমতার জন্য অন্তর্ভুক্তি
- গুরুতর প্রতিবন্ধী (যাদের চলাচলে খুব বেশি সমস্যা হয়) শিশুদের বাদ দেওয়া উচিত নয়। তারা চেয়ার, হুইলচেয়ার বা বিছানায় বসেও তাল অনুভব করতে পারে এবং দলের অংশ হতে পারে।
- প্রাথমিক সেবাদানকারী (যেমন—অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, অভিভাবক, শিক্ষক ইত্যাদি) নিশ্চিত করবেন যে প্রয়োজন অনুযায়ী স্পর্শভিত্তিক সহায়তা ও শারীরিক নির্দেশনা প্রদান করা হচ্ছে, যাতে শিশুরা তাল অনুসরণ করতে পারে, নড়াচড়ায় আনন্দ পায় এবং নিজেদের অন্তর্ভুক্ত মনে করে।
বাড়িতে শেখার প্রসার
- রুটিন: প্রতিদিনের কাজের সময় (যেমন খাবার সময়, গোসলের সময়) শিশুকে গান শোনান বা গান গেয়ে তাল তৈরি করুন।
- বাদ্যযন্ত্র অন্বেষণ: ঘরের জিনিসপত্র (হাঁড়ি, কাঠের চামচ) বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে শিশুকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে উৎসাহ দিন।
- নড়াচড়া ও নাচ: শিশুর পছন্দের সঙ্গীতের সাথে তার সাথে নাচুন বা নড়াচড়া করুন। তাকে নিজে থেকে নড়াচড়া বা অঙ্গভঙ্গি শুরু করতে উৎসাহ দিন।
- অনুরোধ ও পছন্দ প্রকাশ: একটি বাদ্যযন্ত্র সামনে ধরে অপেক্ষা করুন যাতে শিশু তার পছন্দ জানাতে পারে (“আমি ড্রাম চাই”), এতে যোগাযোগ দক্ষতা বাড়ে।
- মোটর দক্ষতা উন্নয়ন: বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে হাত ও পায়ের নড়াচড়া বাড়ানোর সুযোগ দিন।
সঙ্গীতের শক্তি
সঙ্গীত সংযোগ, শেখা ও আত্মপ্রকাশের জন্য আনন্দময় ও শক্তিশালী একটি মাধ্যম তৈরি করে। সহায়ক পদক্ষেপের মাধ্যমে শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুরা সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে পারে, গুরুত্বপূর্ণ জীবনদক্ষতা অর্জন করতে পারে এবং ঘরে ও সমাজে শক্তিশালী সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। এমনকি গুরুতর প্রতিবন্ধী শিশুরাও বসা অবস্থায় অল্প সহায়তার মাধ্যমে সঙ্গীত ও তাল অনুভব করতে পারে।
শেখার মূল বিষয়
- প্রত্যাশা তৈরি, মোটর দক্ষতা বিকাশে সহায়তা ও আত্মপ্রকাশকে উৎসাহিত করতে সঙ্গীতকে একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করুন।
- অন্তর্ভুক্তি ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পরিবারের সদস্য ও সহপাঠিদের সম্পৃক্ত করুন।
- মনে রাখবেন, প্রতিটি শিশুর সঙ্গীত অনুভব করার পদ্ধতি আলাদা। ধৈর্য ধরুন এবং তাদের সংকেত অনুযায়ী সাড়া দিন।
ডাউনলোড
- Microsoft Word